WBCS Mains — History Optional (Paper 1)
Unit A, Topic 6: POST-MAURYAN PERIOD (মৌর্য-পরবর্তী যুগ)
উত্তর ভারত: শুঙ্গ, কাণ্ব, ইন্দো-গ্রিক, শক, কুশাণ, পশ্চিমী ক্ষত্রপ; দাক্ষিণাত্য ও দক্ষিণ ভারত: সাতবাহন, সঙ্গম তামিল রাজ্যসমূহ; সংস্কৃতি, ধর্ম (মহাযান ধর্মের উত্থান), শিল্প ও বিজ্ঞান।
পরিচিতি: কেন এটিকে ‘রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার’ (Fragmentation) যুগ বলা হয়?
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর (আনুমানিক ১৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে পুরো ভারতজুড়ে একক কোনো কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অস্তিত্ব ছিল না। এর পরিবর্তে একাধিক আঞ্চলিক এবং বৈদেশিক বংশোদ্ভূত রাজবংশ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে রাজত্ব করেছিল।
রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও এই যুগটি (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতক থেকে খ্রিস্টীয় ৩য় শতক) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, নগরায়ন এবং সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিশাল অগ্রগতি ঘটেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির জন্য সর্বদাই রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন হয় না।
A. উত্তর ভারত (Northern India)
(a) শুঙ্গ রাজবংশ (c. 185–73 BCE)
* প্রতিষ্ঠা: পুষ্যমিত্র শুঙ্গ শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করে এই বংশ প্রতিষ্ঠা করেন; তাঁদের রাজধানী ছিল পাটলীপুত্রে।
* ধর্মীয় নীতি: ‘দিব্যাবদান’-এর মতো পরবর্তীকালের কিছু বৌদ্ধ গ্রন্থে পুষ্যমিত্রকে বৌদ্ধধর্মের উৎপীড়ক বলা হয়েছে, তবে এটি ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্কিত। তিনি বৈদিক যাগযজ্ঞ (অশ্বমেধ যজ্ঞ) পুনরায় চালু করেন, যা মৌর্য যুগের ধম্ম/বৌদ্ধধর্মের প্রভাবের পর ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দেয়।
* শিল্পে অবদান: সাঁচি স্তূপের তোরণ (Toranas) ও সূক্ষ্ম কারুকার্যময় ভাস্কর্য প্রধানত এই যুগেই নির্মিত ও প্রসারিত হয়েছিল।
🔍 ঐতিহাসিকদের বিতর্ক — পুষ্যমিত্র শুঙ্গ কি সত্যিই ‘বৌদ্ধ-বিরোধী’ ছিলেন?
* পরবর্তী বৌদ্ধ গ্রন্থসমূহ: এই গ্রন্থগুলোতে পুষ্যমিত্রকে এক হিংস্র নির্যাতনকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যিনি স্তূপ ধ্বংস করেছিলেন এবং ভিক্ষুদের হত্যা করেছিলেন।
* আধুনিক ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিভঙ্গি: অধিকাংশ আধুনিক ইতিহাসবিদ এই দাবিগুলোকে সতর্কতার সাথে দেখেন — এগুলো কয়েক শতাব্দী পরে এমন বৌদ্ধ লেখকদের দ্বারা রচিত হয়েছিল, যাঁরা বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক একজন শাসকের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন। সাঁচি স্তূপের জাঁকজমকপূর্ণ তোরণসমূহ যে শুঙ্গ যুগেই নির্মিত হয়েছিল, তা প্রমাণ করে যে বৌদ্ধধর্ম বাস্তবে দমন করা হয়নি।
(b) কাণ্ব রাজবংশ (c. 73–28 BCE)
* মগধে শুঙ্গদের পর আসা একটি স্বল্পস্থায়ী রাজবংশ; সাতবাহনদের দ্বারা কাণ্বদের পতন ঘটে, যা উত্তর ভারতে মগধের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা রাজনৈতিক আধিপত্যের চূড়ান্ত সমাপ্তি নির্দেশ করে।
(c) ইন্দো-গ্রিক / ব্যাকটেরিয়া-গ্রিক (c. 2nd–1st century BCE)
* ব্যাকটেরিয়াতে (মধ্য এশিয়া) আলেকজান্ডারের গ্রিক বসতি স্থাপনকারীদের বংশধর, যাঁরা মৌর্যদের পতনের পর উত্তর-পশ্চিম ভারত আক্রমণ করে শাসন করেন।
* মেনান্ডার (মিলিন্দ): সবচেয়ে বিখ্যাত ইন্দো-গ্রিক রাজা, শায়কল (শিয়ালকোট) থেকে শাসন করতেন। তিনি 'মিলিন্দ পঞ্হ' (রাজা মিলিন্দের প্রশ্নাবলী) নামক বিখ্যাত পালি গ্রন্থের মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মের সাথে যুক্ত — যা ছিল মেনান্ডার এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু নাগসেনের মধ্যে একটি দার্শনিক কথোপকথন।
* মুদ্রাব্যবস্থা: দ্বিভাষিক (গ্রিক এবং খরোষ্ঠী/প্রাকৃত) মুদ্রা প্রবর্তন করেন, যাতে রাজাদের বাস্তবসম্মত প্রতিকৃতি ছিল। এটি অনাবিষ্কৃত বংশাবলি পুনর্গঠনে অত্যন্ত সহায়ক।
* গান্ধার শিল্প: গ্রিক ভাস্কর্য শৈলীকে বৌদ্ধ বিষয়ের ওপর প্রয়োগ করে গান্ধার শিল্পের বিকাশে অবদান রাখেন।
(d) শক রাজবংশ (Scythians, c. 1st century BCE থেকে)
* মধ্য এশিয়ার যাযাবর জাতি, যাঁরা ভারতে শাসনব্যবস্থা স্থাপন করেন — সবচেয়ে বিখ্যাত মালব/গুজরাটের ‘পশ্চিমী ক্ষত্রপ’ এবং মথুরার ‘উত্তর ক্ষত্রপ’।
* প্রথম রুদ্রদমন (c. 130–150 CE): সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শক শাসক; তাঁর ‘জুনাগড় শিলালিপি’ বিশুদ্ধ (ধ্রুপদী) সংস্কৃতে খোদাই করা প্রাচীনতম দীর্ঘ শিলালিপি। এতে মৌর্যদের আমলে নির্মিত ‘সুদর্শন হ্রদ’ সেচ ব্যবস্থার সংস্কারের রেকর্ড রয়েছে।
(e) কুশাণ রাজবংশ (c. 1st–3rd century CE)
* মধ্য এশিয়ার ইউয়ে-চি (Yuezhi) যাযাবর গোষ্ঠীর একটি শাখা; মৌর্য-পরবর্তী যুগে উত্তর ভারতের বৃহত্তম সাম্রাজ্য গড়ে তোলে, যা মধ্য এশিয়া থেকে আফগানিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারত হয়ে গঙ্গা অববাহিকার গভীরে বিস্তৃত ছিল।
* কণিষ্ক: সর্বশ্রেষ্ঠ কুশাণ শাসক; বৌদ্ধধর্মের মহান পৃষ্ঠপোষক। তিনি কাশ্মীরের কুণ্ডলবনে ‘চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি’ আহ্বান করেন, যেখানে মহাযান বৌদ্ধ মতবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ হয়।
* প্রধান কেন্দ্র: পুরুষপুর (পেশোয়ার) ও মথুরা — যা রোম, মধ্য এশিয়া ও চীনকে সংযুক্তকারী রেশম পথ (Silk Road) বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে প্রচুর সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল।
* কণিষ্কের রাজ্যাভিষেকের বছরটি (৭৮ খ্রিস্টাব্দ) আজও ভারতের সরকারি ক্যালেন্ডার ‘শকাব্দ’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
🔍 ঐতিহাসিকদের বিতর্ক — কণিষ্কের সিংহাসনারোহণের সঠিক তারিখ
* কণিষ্কের রাজত্বের শুরুর তারিখ (এবং এটি ৭৮ খ্রিস্টাব্দের সাথে হুবহু মিলে যায় কিনা) তা নিয়ে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিতর্ক চলছে। কিছু পণ্ডিত ৭৮ খ্রিস্টাব্দ পছন্দ করেন, আবার অন্যরা মুদ্রা ও শিলালিপির প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে সামান্য ভিন্ন বছরের যুক্তি দেন।
B. দাক্ষিণাত্য ও দক্ষিণ ভারত (The Deccan and Southern India)
(a) সাতবাহন রাজবংশ (c. 1st century BCE – 3rd century CE)
* দাক্ষিণাত্যের প্রধান শক্তি, রাজধানী ছিল প্রতিষ্ঠানে (পাইঠান); গুরুত্বপূর্ণ শাসক হলেন গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী (যিনি শক পশ্চিমী ক্ষত্রপদের পরাজিত করেছিলেন, যা তাঁর মা গৌতমী বলশ্রী নাসিক শিলালিপিতে উদযাপন করেছেন)।
* প্রশাসন: রাজ্যকে ‘আহার’ (জেলায়) বিভক্ত করেন; ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ মঠগুলোকে ভূমি এবং কর/প্রশাসনিক ছাড় দেওয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য (যা পরবর্তীতে ‘ভারতীয় সামন্তবাদ’ বিতর্কের ভিত্তি তৈরি করে)।
* অর্থনীতি: আরব সাগরীয় উপকূল এবং দাক্ষিণাত্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ করতেন, যা অভ্যন্তরীণ ভারতকে ইন্দো-রোমান সামুদ্রিক বাণিজ্যের সাথে যুক্ত করেছিল।
* ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা: বৈদিক যাগযজ্ঞ সম্পাদনের পাশাপাশি অমরাবতী, নাগার্জুনকোণ্ডা এবং কার্লে ও নাসিকের পাথর কেটে বানানো বৌদ্ধ গুহার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
(b) সঙ্গম যুগের তামিল রাজ্যসমূহ (দূর দক্ষিণ)
দূর দক্ষিণে (তামিলভাষী অঞ্চলে) এক স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যা ‘সঙ্গম সাহিত্য’ নামে পরিচিত — এটি কবিদের সমাবেশে (সঙ্গমে) রচিত কবিতা সংকলন, যা মাদুরাইয়ের পাণ্ড্য রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল।
* তিনটি প্রধান রাজবংশ (মুভেন্দার): চেরা (কেরালা অঞ্চল), চোল (কাবেরী বদ্বীপ/পূর্ব উপকূল), এবং পাণ্ড্য (দূর দক্ষিণ, রাজধানী মাদুরাই)।
* প্রশাসন: মৌর্যদের মতো জটিল আমলাতন্ত্রের প্রমাণ এখানে পাওয়া যায় না — ক্ষমতা ছিল বিকেন্দ্রীভূত এবং গোত্রপ্রধান (tribal-chiefdom) ব্যবস্থার কাছাকাছি।
* অর্থনীতি: উর্বর নদী উপত্যকায় নিবিড় কৃষি (ধান) এবং জোরদার সামুদ্রিক বাণিজ্য — অরিকামেডুতে (পুদুচেরি) প্রাপ্ত রোমান স্বর্ণমুদ্রা এই যুগের তীব্র ইন্দো-রোমান বাণিজ্যের (গোলমরিচ, বস্ত্র, রত্ন রপ্তানি; রোমান মদ, কাচ, সোনা আমদানি) সত্যতা নিশ্চিত করে।
* সামাজিক অবস্থা: সমাজ আংশিকভাবে পেশাভিত্তিক গোষ্ঠীতে সংগঠিত ছিল (সঙ্গম সাহিত্যে 'তিলৈ' বা পরিবেশগত-সাংস্কৃতিক অঞ্চল); উত্তর ভারত থেকে ব্রাহ্মণ্য ভাবধারা ধীরে ধীরে দক্ষিণের বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার সাথে মিশ্রিত হচ্ছিল।
🔍 ঐতিহাসিকদের বিতর্ক — সঙ্গম তামিল রাজনীতি কতটা ‘রাষ্ট্রীয়’ রূপ পেয়েছিল?
* ঐতিহাসিক কে. এ. নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী এদের ঐতিহ্যগত ‘রাজ্য’ বা 'রাজতন্ত্র' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
* সাম্প্রতিক ইতিহাসবিদগণ (যেমন — আর. চম্পকলক্ষমী) জোর দিয়ে বলেছেন যে, এগুলোকে একক ভূখণ্ডভিত্তিক রাজ্যের চেয়ে কৃষিভিত্তিক চিফডম (chiefdoms) এবং বাণিজ্যিক নগরীর নেটওয়ার্কের মিশ্রণ হিসেবে বোঝা ভালো।
C. সংস্কৃতি ও ধর্ম (Culture and Religion)
মহাযান বৌদ্ধধর্মের উত্থান
* এই যুগের একটি প্রধান ধর্মীয় বিকাশ: বৌদ্ধধর্মের হীনযান (প্রাচীনতর সংস্কারবাদী ধারা) এবং মহাযান (‘মহাযান’ বা বড় যান) — একটি নতুন, আরও ভক্তিমূলক ও সহজলভ্য ধারায় বিভাজন।
* মহাযান বোধিসত্ত্ব ধারণার প্রবর্তন করে এবং প্রতীকী উপাসনার পরিবর্তে বুদ্ধের মানবমূর্তি বা প্রতিমা পূজার সূচনা করে।
* কণিষ্কের পৃষ্ঠপোষকতা এবং চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি মহাযান মতবাদের প্রসারে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিল।
* শিল্প কেন্দ্র: গান্ধার (উত্তর-পশ্চিম, গ্রিক ও হেলেনীয় শৈলীর মিশ্রণ) এবং মথুরা (দেশীয় ভারতীয় ঐতিহ্য, লাল বেলেপাথরের ব্যবহার) — উভয় কেন্দ্রেই প্রায় একই সময়ে প্রথম বুদ্ধের মানবাকৃতির মূর্তি তৈরি শুরু হয়।
🔍 ঐতিহাসিকদের বিতর্ক — গান্ধার নাকি মথুরা: বুদ্ধমূর্তি প্রথম কোথায় তৈরি হয়েছিল?
* এটি ভারতীয় শিল্প ইতিহাসের একটি বিখ্যাত অমীমাংসিত বিতর্ক। কিছু পণ্ডিতের মতে গ্রিকো-রোমান প্রভাবযুক্ত গান্ধার শৈলী ছিল উৎস, কারণ হেলেনীয় ভাস্করদের দেব-দেবী ও মানুষের মূর্তি তৈরির দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল।
* অন্যান্য পণ্ডিতদের মতে, মথুরার দেশীয় শিল্পরীতি বিদ্যমান যক্ষ মূর্তির ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে স্বাধীনভাবে এবং প্রায় সমসাময়িকভাবে বুদ্ধমূর্তি বিকাশ করেছিল।
* আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে: উভয় কেন্দ্রই একে অপরের পরিপূরক হিসেবে সমান্তরালভাবে বিকাশ লাভ করেছিল।
D. সাহিত্য ও সংস্কৃতি (Literature and Culture)
* সঙ্গম সাহিত্য (তামিল): প্রেমের কবিতা (অকম) এবং বীরত্বের কবিতা (পুরম) — প্রাচীন দক্ষিণ ভারতের সাধারণ সামাজিক/অর্থনৈতিক জীবন বোঝার অনন্য ধর্মনিরপেক্ষ উৎস।
* মিলিন্দ পঞ্হ (পালি): বৌদ্ধ দর্শনের ওপর প্রশ্নোত্তরধর্মী দার্শনিক গ্রন্থ।
* সংস্কৃত রাজপ্রশস্তি শৈলী: রুদ্রদমনের জুনাগড় শিলালিপিতে সংস্কৃত গদ্য-পদ্যের অলঙ্কৃত শৈলীর প্রাচীনতম উদাহরণ দেখা যায়।
E. শিল্প, স্থাপত্য ও বিজ্ঞান (Art, Architecture and Science)
* গান্ধার শিল্প রীতি: গ্রিকো-বৌদ্ধ রীতিনীতি, ধূসর স্লেট পাথর (grey schist), বাস্তবসম্মত শারীরিক গঠন।
* মথুরা শিল্প রীতি: দেশীয় রীতিনীতি, লাল বেলেপাথর, বুদ্ধ, জৈন তীর্থঙ্কর ও হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি নির্মাণ।
* অমরাবতী শিল্প রীতি (আন্ধ্র): সাদা মার্বেল পাথরে খোদাই করা বুদ্ধের জীবনকাহিনী সংবলিত চমৎকার ভাস্কর্য।
* পাথর কেটে গুহা স্থাপত্য: কার্লে, ভাজা ও নাসিকের চৈত্য (উপাসনা গৃহ) ও বিহার (মঠ)।
* বিজ্ঞান: চরক সংহিতা রচনা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশ (যা পরবর্তীতে গুপ্ত যুগে পূর্ণতা পায়)।
📝 দ্রুত রিভিশন পয়েন্ট (Quick Revision Points)
* উত্তর ভারতের রাজবংশক্রম: শুঙ্গ → কাণ্ব → (একই সাথে আঞ্চলিকভাবে) ইন্দো-গ্রিক, শক, কুশাণ।
* কণিষ্ক (কুশাণ): শ্রেষ্ঠ মৌর্য-পরবর্তী শাসক; ৪থ বৌদ্ধ সংগীতি; শকাব্দ (৭৮ CE)।
* দাক্ষিণাত্য ও দক্ষিণ: সাতবাহন (গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী) এবং সঙ্গম যুগের তামিল রাজবংশ (চেরা-চোল-পাণ্ড্য)।
* প্রধান ধর্মীয় পরিবর্তন: হীনযান থেকে মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিকাশ; বুদ্ধের প্রতিমাপূজা শুরু।
* শিল্পরীতি: গান্ধার (গ্রিকো-বৌদ্ধ) | মথুরা (দেশীয়) | অমরাবতী (সাতবাহন দাক্ষিণাত্য)।
WBCS Mains — History Optional (Paper 1) — PYQ Answer Booster
Fully Worked-Out Answer for 20 Marks
Q. Give an overview of the cultural contributions of the Kushana dynasty. (20 Marks)
(কুশাণ রাজবংশের সাংস্কৃতিক অবদানের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। — ২০ নম্বর)
📝 উত্তর সংকেত/কাঠামো:
ভূমিকা → ধর্মীয় অবদান (মহাযান বৌদ্ধধর্ম ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতা) → শিল্পকলা (গান্ধার ও মথুরা শিল্পরীতির বিকাশ) → সাহিত্য ও ভাষার বিকাশ → বিজ্ঞান (চিকিৎসাবিজ্ঞান) → সংস্কৃতির প্রমাণ হিসেবে মুদ্রা ব্যবস্থা → প্রশাসনিক-সাংস্কৃতিক সমন্বয় → উপসংহার।
মূল উত্তর:
ভূমিকা:
মৌর্য-পরবর্তী ভারতের ইতিহাসে কুশাণ রাজবংশের রাজত্বকাল (আনুমানিক ১ম থেকে ৩য় খ্রিস্টাব্দ) রাজনৈতিক সীমানা অতিক্রম করে এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল। কণিষ্কের মতো মহান শাসকের অধীনে কুশাণ সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া, চীন, পারস্য এবং গ্রিকো-রোমান বিশ্বের সাথে ভারতের সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করেছিল।
১. ধর্মীয় অবদান ও মহাযান বৌদ্ধধর্মের উত্থান:
* চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি: সম্রাট কণিষ্ক কাশ্মীরের কুণ্ডলবনে (মতান্তরে জালন্ধরে) বিখ্যাত ‘চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি’ আহ্বান করেন। পার্স্ব ও বসুমিত্রের পরিচালনায় গঠিত এই সম্মেলনে প্রায় ৫০০ জন ভিক্ষু অংশ নেন এবং মহাযান বৌদ্ধধর্মের মূল মতবাদগুলো প্রাকৃতের বদলে সংস্কৃতে ‘মহাবিভাষা শাস্ত্র’ গ্রন্থে আনুষ্ঠানিকভাবে সংকলিত হয়।
* বৌদ্ধধর্মের আন্তর্জাতিকীকরণ: কুশাণদের রাজত্বকালেই সিল্ক রোড ধরে তিব্বত, চীন ও মধ্য এশিয়ায় বৌদ্ধধর্মের প্রচার ঘটে, যা একে একটি সর্বভারতীয় ধর্ম থেকে বিশ্বধর্মে রূপান্তরিত করে।
* ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সমন্বয়বাদ: কুশাণদের মুদ্রাগুলো তাঁদের অভূতপূর্ব ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রমাণ দেয়। তাঁদের মুদ্রায় ভারতীয় দেব-দেবী (বুদ্ধ, শিব/Oesho), গ্রিক দেবতা (হেলিওস), পারসিক/জরথুষ্ট্রীয় দেবতা (মাও, আথশো) এবং মেসোপটেমীয় দেবী (নানা)-র প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ ছিল।
* ভিমা কদফিসেস শিবের উপাসক (মহেশ্বর) ছিলেন, যা প্রমাণ করে যে কুশাণ আমলে বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি ব্রাহ্মণ্যধর্মও (বিশেষ করে শৈব ও ভাগবত ধর্ম) সমানভাবে বিকশিত হয়েছিল।
> 📚 উৎস সংক্রান্ত তথ্য: কিছু প্রবীণ ঐতিহাসিক (যেমন কে. পি. জয়সোয়াল) কুশাণদের 'ম্লেচ্ছ' আখ্যা দিয়ে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের কথা বললেও, আধুনিক গবেষণায় এর কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা পাওয়া যায়নি। কুশাণরা সব ধর্মের প্রতিই উদার ছিলেন।
>
২. শিল্পকলা: গান্ধার ও মথুরা শিল্পরীতি:
* গান্ধার শিল্প (Greco-Buddhist Art): কণিষ্কের সময় গান্ধার অঞ্চলে (বর্তমান আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) ভারতীয় বৌদ্ধ ভাবধারা এবং গ্রিকো-রোমান শিল্পকলার সংমিশ্রণে 'গান্ধার শিল্পরীতি'র বিকাশ ঘটে। ধূসর স্লেট পাথরে তৈরি বুদ্ধের মূর্তিগুলোতে গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর মতো ঢেউখেলানো চুল, সুগঠিত পেশী এবং তোগা জাতীয় পোশাকের স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়।
* মথুরা শিল্প (Indigenous Indian School): যমুনা নদীর তীরে দেশীয় লাল বেলেপাথরে গড়ে ওঠা মথুরা শিল্পরীতির মাধ্যমে একই সাথে তিন ধর্মের — বৌদ্ধ, জৈন (কঙ্কালী টিলার তীর্থঙ্কর মূর্তি) এবং হিন্দু দেব-দেবীর (শিব, বিষ্ণু, সূর্য, দুর্গা) মূর্তি তৈরি হতে থাকে।
* প্রথম বুদ্ধমূর্তি: এই দুই শিল্পরীতির মাধ্যমেই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বুদ্ধের অনুরাগী ও ভিক্ষুরা বুদ্ধকে কোনো চিহ্নের (যেমন পাদপদ্ম বা আসন) পরিবর্তে মানবমূর্তিতে রূপায়িত করতে শুরু করে।
৩. সাহিত্যের বিকাশ ও সংস্কৃতের প্রসার:
* অশ্বঘোষ: কণিষ্কের রাজসভার রত্ন কবি অশ্বঘোষ ধ্রুপদী সংস্কৃত কাব্যশৈলীতে বুদ্ধের জীবন চরিত ‘বুদ্ধচরিত’ এবং ‘সৌন্দরনন্দ’ রচনা করেন। এছাড়া তাঁর রচিত ‘শারিপুত্রপ্রকরণ’ হলো প্রাচীনতম লভ্য সংস্কৃত নাটক।
* বসু মিত্র: মহাযান দর্শনের আকর গ্রন্থ ‘মহাবিভাষা’ সংকলন করেন।
* নাগার্জুন: মহাযান বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান দার্শনিক ও 'মাধ্যমিক মতবাদ'-এর প্রবক্তা নাগার্জুনও কণিষ্কের সমসাময়িক ছিলেন।
* এই যুগে বৌদ্ধ পণ্ডিতরা পালির পরিবর্তে রাজসভা ও ধর্মীয় আলোচনার জন্য সংস্কৃত ভাষা গ্রহণ করতে শুরু করেন, যা ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিরাট মাইলফলক।
৪. বিজ্ঞানের অগ্রগতি (চিকিৎসাবিজ্ঞান):
* বিখ্যাত চিকিৎসক চরক কুশাণ রাজসভার সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে ‘চরক সংহিতা’ রচনা/সংকলন করেন, যার জন্য তাঁকে 'আয়ুর্বেদের জনক' বলা হয়।
৫. মুদ্রাব্যবস্থা: উন্নত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান:
* কুশাণ রাজা ভিমা কদফিসেস ভারতে বিপুল পরিমাণে খাঁটি স্বর্ণমুদ্রা চালু করেন। কুশাণদের স্বর্ণমুদ্রা পরবর্তীতে গুপ্ত যুগের মুদ্রাব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করেছিল।
* মুদ্রায় ব্যবহৃত লিপি (গ্রিক ও খরোষ্ঠী) এবং বহুজাতিক দেব-দেবীর চিত্র তাঁদের সর্বজনীন সাংস্কৃতিক ভাবমূর্তিকে প্রতিফলিত করে।
৬. প্রশাসনিক-সাংস্কৃতিক পদবী:
* কুশাণ রাজারা বিভিন্ন সভ্যতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বৈচিত্র্যময় রাজকীয় পদবী গ্রহণ করেছিলেন — যেমন চীনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ‘দেবপুত্র’ (Son of Heaven), পারস্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ‘শাহি-শাহানশাহি’ (King of Kings) এবং রোমানদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ‘কায়সার’ বা ‘সিজার’।
উপসংহার:
কুশাণদের সবচেয়ে বড় অবদান কোনো একক বিজয় বা স্থাপত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁদের প্রধান অবদান ছিল এক বিশাল ‘সাংস্কৃতিক সেতু’ (Cultural Bridge) হিসেবে কাজ করা। তারা ভারত, মধ্য এশিয়া, পারস্য, গ্রিক-রোমান বিশ্ব এবং চীনকে বাণিজ্য ও সংস্কৃতির এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। কণিষ্কের বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা, গান্ধার ও মথুরা শিল্পের বিকাশ এবং সংস্কৃত সাহিত্যের পুনরুত্থান কুশাণ যুগকে ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম একটি বিশ্বজনীন ও সৃজনশীল যুগে পরিণত করেছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন